আফিম এলো কোথা থেকে?

আমরা সবাই আফিমখোর কমলাকান্তের কথা শুনেছি। কিন্তু কখনো কি মনে প্রশ্ন জেগেছে আফিম কি আর কোথা থেকেই বা এসেছে এটি? দক্ষিণ ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ায় আফিমের জন্ম। প্রায় দুই হাজার বছর থেকেই গ্রিকরা আফিমের ভেশজ গুন সম্পর্কে জানতো। দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত এশিয়া মাইনরের প্রধান রপ্তানিযোগ্য পণ্যই ছিল আফিম। আগে ইরান ও তুরুস্কে প্রচুর পরিমাণে আফিম উৎপাদন করা হতো। ইতিহাসবিদরা ধারণা করেন, ভারতে প্রথম আফিম আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আর ষোড়শ শতাব্দের প্রথম দিক থেকেই বাংলায় শুরু হয় আফিমের উৎপাদন। আফিম গ্রিকে “Opion” ইংরেজিতে “Opium” সংস্কৃতিতে “অহিফেন” এবং হিন্দিতে “অফীম”। আর বাংলায় আফিম শব্দটি এসেছে মূলত আরবি থেকে।

চীনের চিং সরকার ঔষধ ও চিকিৎসার জন্য খুবই অল্প পরিমাণে আমদানির অনুমতি দিতো। ১৭৬৭ খ্রিষ্টাব্দের পূর্ব পর্যন্ত চীনে আফিম আমদানি করা হতো ভারত থেকে। তৎকালীন সময়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে ভারতে আফিমের একচেটিয়া ব্যবসা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। পরে ১৭৯৭ সালে তাদের একচেটিয়া আফিম উৎপাদনের অনুমতিও দেওয়া হয়। তারা আফিমের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কৃষকদের উপর অমানবিক অত্যাচার করতো এবং পপি চাষ করতে বাধ্য করতো। আফিম বানানোর জন্য কলকাতায় আফিম তৈরির ফ্যাক্টরি স্থাপন করে এবং চীনাদের জন্য বিশেষ ধরনের আফিম তৈরি করতো।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, শুধুমাত্র ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নয়, জেমস ম্যাথিসনের মতো অনেকেই তখন ধনকুবের হয়েছিলেন। জেমস ম্যাথিসন চীন থেকে বাণিজ্য করে ফিরে এসে স্কটল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলে একটি দ্বীপ কিনে নেন। এমনকি মহারানী ভিক্টোরিয়া তাকে “নাইট” উপাধিতে ভূষিত করেন। চীনে শুধু ধনী লোক নয়, সাধারন মানুষও আফিমে আসক্ত হয়ে গিয়েছিল। ইতিহাস থেকে দেখ যায় যে, ১৮২৩ থেকে ১৮৩৪ খ্রিষ্টাব্দ এই ১১ বছরে আফিম বিক্রি করে প্রায় আড়াই কোটি ডলার সমমূল্যের রুপা নিয়ে যায় ব্রিটেন। এভাবেই ব্রিটেন ফতুর করেছিল চীনকে। এই লুণ্ঠনে যোগ দেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও। তারা তুরুস্ক এবং ইরান থেকে চোরাচালানের জন্য আফিম আনতো।
চীনে অনেকবার আফিম নিষিদ্ধ হলেও চোরাচালান বন্ধ হয়নি। তাই ১৮৩৯ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশদের প্রায় ২০ লাখ পাউন্ড স্টারলিং মূল্যের আফিম ধ্বংস করে দেয় চীন। আর এতেই লেগে যায় বিরাট যুদ্ধ। ১৯৪০ সালে এ যুদ্ধ শুরু হয় আর নানকিং চুক্তির মাধ্যমে ১৯৪২ সালে এ যুদ্ধ শেষ হয়। ইতিহাসে এটি অবশ্য Opium War বা আফিম যুদ্ধ নামেই পরিচিত। শুধু চীনেই নয়, ব্রিটিশরা ভারতের মানুষদের এক অংশকেও আফিমে আসক্ত করে ফেলেছিল।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *