পেন্টাকল, প্রাচীন নারী এবং ভিঞ্চির যোগসূত্র

পৃথিবীর ইতিহাসে যুগ যুগ ধরে নারীরা বিভিন্ন ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। কখনো কখনো নারীকে আখ্যায়িত করা হয়েছে জ্ঞানী, বুদ্ধিমতী, লাস্যময়ী, চঞ্চলা নামে, আবার কখনো বা ছলনাময়ী নামেও। কেননা নারী বরাবর ই  রহস্যময়ী। রহস্যময়ী বলেও কিন্তু বিজ্ঞানীরা থেমে নেই, রীতিমত প্রাচীনকাল থেকেই গবেষণা করে আসছেন। তবে নারীর রহস্যময় আচরন না ধরতে পারলেও ক্ষতি নেই। চলুন একটু জেনে নাওয়া যাক প্রাচীনকালে নারীদের আসলে কোন জায়গাটা দিয়েছিল প্রকৃতি।

পেন্টাকলঃ
পেন্টাকল যা একটি প্যাগান ধর্মীয় প্রতীক। এখানে প্রশ্ন দাড়ায় প্যাগান ধর্মটি কি? শব্দটির মুল এসেছে “প্যাগানাস” থেকে। এর অর্থ “গ্রামীণ অধিবাসী”। আভিধানিক অর্থে “প্যাগান” মানে অশিক্ষিত গ্রাম্য লোকজন। যারা প্রাচীন প্রকৃতি পূজার অনুসারী। যারা ভিলেজ বা গ্রামে বাস করত তাদের চার্চের প্রতি অনেক ভীতি ছিল। সেই থেকেই গ্রামবাসী বা ভিলেজার শব্দটি থেকেই ভিলেইন  অর্থাৎ খল শব্দটি এসেছে।  পেন্টাকল একটি প্রাক খ্রিস্টীয় প্রতীক যা প্রকৃতি পূজার সাথে সম্পর্কিত। প্রাচীনকালে মানুষেরা প্রকৃতি কে দুই ভাগে ভাগ করে ফেলল -নারী এবং পুরুষ। তাদের দেব দেবীরা শক্তির ভারসাম্য রক্ষা করত যা ছিল ইন এবং ইয়াং। যখন নারী পুরুষে ভারসাম্য পূর্ণ থাকত তখন সম্প্রীতি বিরাজ করত। আর যখন ভারসাম্যহীন হত তখন নৈরাজ্য নেমে আসত। এই পেন্টাকল নারীর প্রতিনিধিত্ব করে যারা পৃথিবীর সবকিছুরই অর্ধেক। তাদেরকে “পবিত্র নারী” বা “স্বর্গীয় নারী ” বলা হত।

পেন্টাকল ভেনাসেরই প্রতীক যা যৌনতা, ভালবাসা এবং সৌন্দর্যকে প্রতিফলিত করে। প্রথম দিকে ধর্মগুলো ছিল স্বর্গীয় শৃঙ্খলার উপর ভিত্তি করে। দেবী ও ভেনাস গ্রহ একই জিনিস। রাতের আকাশে দেবীর একটি অবস্থান আছে যা ইস্টার, ভেনাস, পূর্ব তারা, এস্টারতে নামে পরিচিত এবং এর প্রত্যেকটিই শক্তিশালী নারীর প্রতিভূ। এগুলো মাতৃদেবীর সাথে সম্পর্কযুক্ত।
ভেনাস গ্রহ প্রতি আট বছরে যে অবস্থান পরিবর্তন করে সেটা একটি নিখুঁত পেন্টাকলেরই আকৃতি। এই ঘটনাটা প্রাচীন মানুষকে এতটাই বিস্মিত করেছিল যে তারা ভেনাস বা পেন্টাকল কে নিখুত,সুন্দর ও যৌনতার প্রতীক  হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। ভেনাসের এই জাদুময়তা কে সম্মান প্রতিষ্ঠা করার জন্যই গ্রিকরা প্রতি আট বছর পর পর খেলার আয়োজন করেন। খুব অল্প সংখ্যক লোকই জানেন যে অলিম্পিক এর পাঁচটি বৃত্ত আসলে শেষ মুহূর্তে পাঁচটি তারা পরিবর্তন করেই হয়েছে যা সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
মজার ব্যাপার হল পেন্টাকলকে অনেকেই শয়তানের সমর্থক শব্দ বলে থাকেন যা একটি জনপ্রিয় ভুল ধারনা। এটি পুরপুরি দেবতা সম্পর্কীয়। শুধু তাইনা পসাইডন দেবতার ত্রিশূল হয়ে উঠে শয়তানের লাঠি ,জ্ঞানী ক্রনের লম্বা টুপিটা ডাইনীর প্রতীকে পরিনত হয়। নগ্নতা যৌনতার দেবী ভেনাসের প্রতিমূর্তিকেই ইঙ্গিত করে। ভেনাস উৎপত্তি হয়েছে “ভেনারেল “শব্দটি থেকেই যার অর্থ যৌনসংগম। প্রকৃতিতে ঈশ্বরের হাতের প্রমাণ রয়েছে এমনকি আজকের দিনেও প্যাগানদের অস্তিত্ব  রয়েছে।

দ্যা ভিঞ্চিঃ
ভিঞ্চির একটি বিখ্যাত  ছবি “ভিট্রুভিয়ান ম্যান”। এটাকে সেই সময়ে এনাটমিকাল সবচেয়ে বিশুদ্ধতম ছবি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ছবিটি তে দেখা যায় একতা নিখুঁত বৃত্তের মধ্যে একজন নগ্ন পুরুষ ডানা ছড়ানো ঈগল পাখির মত তার হাত পা ছড়ানো। বৃত্তটি নারীত্বের রক্ষার প্রতীক ,নগ্ন লোকটাকে ঘিরে রেখে বোঝানো হয়েছে নারী ও পুরুষের সম্প্রীতি । শুধু তাইনা তিনি ছিলেন একজন সমকামী এবং প্রকৃতির স্বর্গীয় শৃঙ্খলের পূজারী। তিনি প্যাগানদের ক্রুশ এ বিশ্বাস করতেন যা খ্রিস্টীয় ধর্মের অনুকরনে নয়, এর উভয়পাশেই ছিল সমান। তিনি বিশ্বাস করতেন যে তার আয়ত্তে রয়েছে সেই আলকামি যা দিয়ে সীসা থেকে সোনা তৈরি করা যায়। এমনকি ঈশ্বরকে ফাঁকি দিয়ে মৃত্যু কে থামিয়ে দেওয়া যাবে।

লিওনার্দো চার্চের অনুরধে কিছু ছবি আঁকলেও টা কোনভাবেই খ্রিস্টীয় কিছু ছিলনা। তাঁর হাতে আঁকা ছবি তে তিনি এমনকিছু প্যাগান সিম্বল লুকিয়ে রাখতেন। তিনি ফিবনাক্কি সংখ্যা আবিষ্কার করেন যা শুধু অসাধারন প্যাটার্ন ই নয়, এর মধ্যে লুকিয়ে আছে অনেক রহস্য। কিছু রহস্যের উদাহরন দেওয়া যাক। ১-১-২-৩-৫-৮-১৩-২১ এই ফিবনাক্কি সংখ্যাটি তে একটু লক্ষ করে দেখুন যে শুধু প্রথম দুইটি সংখ্যা যোগ করে যে পরের সংখ্যাটি হয় তাই ই না বরং সন্নিহিত সংখ্যার ভাগফল বিস্ময়কর সংখ্যা ১.৬১৮ যা ফি সংখ্যা হিসেবে পরিচিত। ফি সংখ্যা কে মহাবিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর সংখা হিসেবে গণ্য করা হয়। কেন আমরা এটা কে সবচেয়ে সুন্দর সংখ্যা বলছি? তাঁর কারন ভিঞ্চি ই প্রথম দেখিয়েছিলেন  যে মানুষের সবসময়ই ফি এর হিসেবে থাকে। মাথা থেকে পা পর্যন্ত মেপে  তারপর মাথা থেকে নাভি পর্যন্ত মাপ দিলে যা হয় তা দিয়ে সেটা কে ভাগ করলে ফি সংখ্যা পাওয়া যায় একইরকম কাধ থেকে হাতের আঙ্গুল পর্যন্ত মাপ নিয়ে তাকে বাহু থেকে আঙ্গুল পর্যন্ত যে মাপ হয় তা দিয়ে ভাগ করলেও ফি সংখ্যা, একইভাবে পা থেকে হিপের মাপকে পা থেকে হাঁটুর তা দিয়ে ভাগ করুন পেয়ে যাবেন ফি সংখ্যা। আসলে ভিঞ্চি শবদেহ সবচ্ছেদ করে তিনি এটা আবিষ্কার করে ছিলেন। তখনকার দিনে মানুষের শরীরের স্বর্গীয় ব্যাপার ভিঞ্চি ছাড়া আর কেউ বুঝতনা। পুরুষ  মৌমাছির সংখ্যা দিয়ে স্ত্রী মৌমাছির সংখা কে ভাগ করলে ফি সংখ্যা পাবেন। প্রকৃতির পরতে পরতে এই সংখ্যা লুকিয়ে আছে। সূর্যমুখীর বিপরীত চক্রাকারে বেরে উথা,পদ্ম ফুল,গাছ পালার পাতার বিন্যাস ,পোকামাকড়ের বিভাজন সবগুলো বিস্ময়কর ভাবে স্বর্গীয় অনুপাত মেনে চলে। প্রকৃতিতেই ঈশ্বরের হাতের প্রমাণ রয়েছে আর তাই ভিঞ্চি এবং প্যাগান রা প্রকৃতির পুজা করে।

প্রাচীন নারীঃ
প্রাচীন নারীদের সাথে যে বিভিন্ন প্রতীকের যোগসূত্র ছিল তা আগেই কিছুটা বলা হয়ে গেছে। কিন্তু আরও একটু বাকি আছে। ভিঞ্চির মোনালিসা ছবিটি দেখেছেন কি??ভিঞ্চি বামদিকের আনুভুমিক রেখাটি উদ্দেশমূলক ভাবেই একটু নিচু করে এঁকেছেন। এর কারন ছিল মোনালিসা কে যেন ডান দিকের চেয়ে বাম দিকে বড় লাগে। ঐতিহাসিক ভাবেই বাম দিক নারীর আর বাম দিক পুরুষের। যেহেতু ভিঞ্চি নারীবাদের একজন বড় ভক্ত ছিলেন তাই তিনি মোনালিসা এমনভাবে এঁকেছেন যেন ডান দিকের তুলনায় বাম দিকে একটু বড় লাগে।

 ভিঞ্চি ছিলেন নারী পুরুষের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ একজন বাক্তি। তিনি বিশ্বাস করতেন যতক্ষণ একজন মানুষের মধ্যে একজন নারী পুরুষ উভয়ের উপাদান না থাকবে ততক্ষন পর্যন্ত তাঁর আত্মা আলোকিত হবে না। মোনালিসা না পুরুষ না মহিলা, আসলে দুইটোরই মিলিত রুপ। মোনালিসা যে নারী পুরুষ উভয়ের একটি মিলিত রুপ এখনি পরিস্কার হয়ে যাবে আপনাদের কাছে। মিসরীয় দেবতা “আমন” যাকে পুরুষ উর্বরতার দেবতা হিসেবে বলা হয়। আমন ভেড়া মাথাওয়ালা যা পুরুষের প্রতিনিধিত্ব করে। তাঁর বাঁকানো শিং আমাদের আধুনিক যৌন স্লাং হর্নি র সাথে সম্পর্ক যুক্ত। আর তাঁর সঙ্গী আইসিস যে নারী উর্বরতার প্রতীক যাকে “লিসা” হিসেবে ডাকা হত। এই দুটোকে এক করলে হয় AMONLISA.যা সাজালে দাঁড়ায় MONALISA। খ্রিস্টানরা খুব সফল ভাবেই প্যাগান মাতৃতান্ত্রিক সমাজ কে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পরিনত করেছেন। সে এক জঘন্য ইতিহাস। চার্চ যাদেরকে ডাইনি তারা হল জিপসি, নারী যাজক, জ্ঞানী ও আধ্যাত্মিক নারী বাক্তিত্ব এরকম ৫০ লক্ষ নারী কে পুরিয়ে মারা হয়েছিল। তারা মনে করত হাওয়া গন্ধম ফল খাওয়ার কারনেই নারীদের প্রসব বেদনা হয়। ঈশ্বর তাদের এভাবেই শাস্তি দেন। এজন্যই নারীরা আজ বহু বহু বছর পিছিয়ে। কারন তারা আজকে থেকে শোষিত নয় তারা তো অনেক আগে থেকেই শোষিত। নারীদের সংশ্লিষ্ট বাম দিকটাও চার্চের কাছ থেকে রেহাই পায় নি। বাম মস্তিস্ককে শয়তানের মস্তিস্ক, উগ্রবাদি চিন্তা সমুহ কে বাম পন্থী আর ডান হল সততা আর বিশুদ্ধতার প্রতীক। আর এভাবেই গড়ে ওঠে আজকের অস্থিতিশীল সমাজ। নারী বিদ্বেষী মনোভাব যা ধরিত্রী মাতা কে ক্রমবর্ধমানভাবে অসাম্মান করে যাচ্ছে।

এই ছিল প্রাচীন নারী,প্যাগান নারীতান্ত্রিক সমাজ এবং লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির বিশ্বাস। নারীরা আসলেই বহু বছর ধরেই উপেক্ষিত; যদিও বিভিন্ন ধর্মে নারীদের সম্মান দেওয়া হয়েছে এবং ইসলামে এই সন্মানের পূর্ণতা রয়েছে; কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তাদের দোষগুলো ধরার চেয়ে নারীর দোষগুলো খুজতেই বেশি ব্যস্ত। কিন্তু আমরা সকলেই স্বীকার করতে বাধ্য যে নারী ছাড়া পুরুষ অচল আবার নারীও পুরুষ ছাড়া অচল। তাই তো নজরুল সাম্যের গান গেয়ে বলেছেন-
বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *